প্রকৃতি ও অর্থনীতির মিলনমেলা
ভাসমান পেয়ারা বাগানে প্রাণের স্পন্দন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০৩:০০:৪২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০৩:০১:৫৮ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটায় মুখর খাল। সেই খালের বুক চিরে ছুটে চলছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। আর নৌকাভর্তি টাটকা পেয়ারা। খালের দুই পাশে সারি সারি সবুজ পেয়ারা বাগান। কৃষকেরা সেখান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে নৌকায় ভরে নিয়ে যাচ্ছেন ভাসমান হাটে। সেখান থেকে ট্রলার ও ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের সুস্বাদু এই ফল। প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবিকার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা বাগান।
বরিশাল বিভাগের পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠি, ভীমরুলী, আদমকাঠি, ধলহার এবং ঝালকাঠি জেলার কয়েকটি ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত এ ভাসমান পেয়ারা বাগান।
আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এই ৩ মাস জমে ওঠে পেয়ারার মৌসুম। খালের ওপর বসে ভাসমান হাট। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে পেয়ারা কিনে নিয়ে যান।
সরেজমিনে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর পুরো এলাকা। খালের বুকে সারিবদ্ধ নৌকা, চারপাশে সবুজ পেয়ারা বাগান আর ব্যস্ত ভাসমান হাট মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদ উপজেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৩৮৪ জন কৃষক প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ করছেন। অন্যদিকে ঝালকাঠি সদর উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার কৃষক ২৯৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা উৎপাদন করছেন। গত বছর হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ছিল প্রায় সাড়ে ৯ টন।
কৃষকেরা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর পেয়ারার দাম কিছুটা বেশি। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ভরা মৌসুমে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
স্থানীয় কৃষক ফরিদ মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম একটু ভালো। তবে পেয়ারায় সিট রোগ দেখা দেওয়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। ১ মণ পেয়ারার মধ্যে ৫-৭ কেজি পর্যন্ত বাদ দিতে হয়। পেয়ারা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণের জন্য যদি সরকার হিমাগারের ব্যবস্থা করে, তাহলে কৃষকেরা আরও লাভবান হবেন।
বাগেরহাটের কচুয়া থেকে পেয়ারা কিনতে আসা ব্যবসায়ী মো. রোমান বলেন, স্বাধীনতার ৩ বছর আগে থেকেই এখানে ব্যবসা করছি। এখানকার পেয়ারা দেশের অন্যতম সেরা। মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি। তাই এই জায়গা থেকে পেয়ারা কিনে বাগেরহাটে গিয়ে বিক্রি করি।
স্বরূপকাঠি থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেয়ারা পরিবহনকারী ট্রাকচালক আব্দুর রহিম বলেন, এখানকার রাস্তা সরু হওয়ায় পরিবহনে সমস্যা হয়। একটি গাড়ি গেলে আরেকটি গাড়ি চলাচল করতে পারে না। এতে প্রায়ই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
শুধু কৃষি নয়, এই ভাসমান পেয়ারা বাগান এখন দেশের অন্যতম কৃষিভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন। কেউ ট্রলারে, কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে, আবার কেউ শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে এই বাগান দেখতে আসেন। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় পুরো এলাকা।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা মোরশেদা বেগম বলেন, জায়গাটি অসাধারণ সুন্দর। ঢাকায় বসে তো এমন প্রকৃতি, এত গাছ, এত ফলমূল দেখতে পাই না। খালের দুই পাশে ফলভর্তি গাছ, ট্রলারে ঘুরে পুরো পরিবেশ উপভোগ করেছি। আমার সন্তানও খুব আনন্দ পেয়েছে।
তবে পর্যটকদের অভিযোগও রয়েছে। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই, অনেক সড়ক ভাঙাচোরা, পাবলিক টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানিরও সংকট রয়েছে। এসব কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয় দর্শনার্থীদের।
পিরোজপুরের আটঘর পেয়ারা বাগানে ঘুরতে আসা মাহিন ইসলাম বলেন, জায়গাটি সত্যিই অসাধারণ। কিন্তু গাড়ি রাখার ব্যবস্থা, ভালো রাস্তা ও পাবলিক টয়লেটের মতো মৌলিক সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, ভাসমান পেয়ারা বাজারকে কেন্দ্র করে পর্যটন ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে পর্যটক ও স্থানীয় সহ সকলের যা যা করণীয় সে সম্পর্কে আমরা অবহিত করেছি। কিভাবে এই পর্যটন কেন্দ্র আরো বেশি সুন্দর করা যায়। পর্যটকদের নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার সুবিধা এবং বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স